দুই দিনের ভেনিস ভ্রমণ- A weekend in Venice

ভেনিস শহরের নাম প্রথম শুনি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের “মার্চেন্ট অফ ভেনিস” নাটকে। তখন শুধু ভেবেছিলাম ধনী ভেনেসিয়ানদের কথা, এর সৌন্দর্য নিয়ে কিছু জানতাম না। পরবর্তীতে যখন বিভিন্ন পর্যটক সম্পর্কে আগ্রহ জন্মাল, তখন জানতে পারলাম মার্ক পোলোর ব্যাপারে। মার্ক পোলো প্রথম ইউরোপিয়ান, যিনি স্থলপথে ইউরোপ থেকে চীনে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভেনেসিয়ান। বিভিন্ন সিনেমায় ভেনিসের বিভিন্ন দৃশ্য দেখে বুঝে নিয়েছিলাম- জীবনে কখনও না কখনও ভেনিস যেতেই হবে। অবশেষে ২০১৩ সালে সেই আশা পূরণ হলো।

পড়াশোনার কারণে ২০১১ সাল থেকেই আছি জার্মানিতে। ২০১৩ সালে ছিলাম মিউনিখ থেকে প্রায় ১৫০ কি.মি. দূরের ছোট একটা শহরে। জার্মানির সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রেন যোগাযোগ খুবই ভাল। মিউনিখ থেকে একটা ট্রেন আছে-সিটি নাইট লাইন, যেটা রাত ৯.৩০টায় মিউনিখ থেকে ছাড়ে, ভোর ৬.৩০টায় ভেনিস পৌছায়। এদিকে দেশে গিয়ে বেশীদিন থাকার আশায় অন্যান্য সময় ছুটি কম নেয়ার চেষ্টা করি। একারণে আমি আর আমার বর মিলে প্ল্যান করলাম উইকএন্ডে যাব। শুক্রবার আর রবিবার রাতে ট্রেনেই ঘুমাব আর মাঝখানে শুধু শনিবার রাতে হোটেলে থাকতে হবে। মাত্র একরাত থাকব বিধায় ট্রেন ষ্টেশনের খুব কাছেই একটা বেশ দামি হোটেলে ঘর ভাড়া করলাম।

পরিকল্পনা মত নির্ধারিত দিনে আমরা প্রথমে মিউনিখ গেলাম, সেখান থেকে ট্রেনে উঠলাম ভেনিসের উদ্দেশ্যে। সিটি নাইট লাইনের ট্রেনগুলোতে আবার স্লিপিং বার্থ থাকে। ছয়জনের একটা রুমের ভেতরে, আমাদের দুজনের জন্য দুটো স্প্লিং বেড বুক করেছিলাম। ট্রেন ছাড়া মাত্রই টিকেট চেকার এসে আমাদের সবার টিকেট, পাসপোর্ট আর রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে গেল। সেনগেন জোনের মধ্যে বর্ডার চেকিংয়ের নিয়ম না থাকলেও, এটা ইতালির নাকি নতুন নিয়ম। এই নিয়ে আমাদের রুমের বাকি সব কোরিয়ান যাত্রীদের সাথে এক দফা কথা কাটাকাটি হলো টিকেট চেকারের। অবশেষে আমাদের সবাইকে দেশ ও পরিচয়হীন করে টিকেট চেকার দরজা বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়ে চলে গেল!

সান্তা লুচিয়া ট্রেন স্টেশন
সান্তা লুচিয়া ট্রেন স্টেশন

খুব ঘন ঘন ঘোরাঘুরি করার কারণে আমাদের দুজনের কারোই মোশন সিকনেস নেই। ট্রেনে উঠেই দিলাম এক ঘুম! সকাল ৬টা থেকেই টিকেট চেকার এসে ডাকাডাকি শুরু করল। আমরা উঠে প্রথমেই আমাদের কাগজপত্র বুঝে নিলাম। তারপর সব গুছিয়ে নামলাম ভেনেযিয়া সান্তা লুচিয়া ষ্টেশনে। স্টেশন থেকে বের হয়েই পেলাম গ্র্যান্ড ক্যানালের এক ঝলক। ক্যানাল জুড়ে বিভিন্ন জলযান। ষ্টেশনের একদম কাছেই ছিল হোটেল। যেহেতু দুপুর দুইটার আগে রুম পাবো না, তাই হোটেলে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। প্রথমেই কিনলাম একটা ম্যাপ।

ভেনিসের প্রথম ঝলক
ভেনিসের প্রথম ঝলক

এখন ভেনিস নিয়ে দু’চারটা কথা বলে নেই। ভেনিস পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় দশটা টুরিস্ট ডেসটিনেশনের একটা। বছরজুড়ে প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার টুরিস্ট বেড়াতে আসে এখানে। ভেনিস আসলে একশ সতেরটা দ্বীপ আর তাদেরকে সংযুক্ত করে রাখা চারশ নয়টা ব্রিজ নিয়ে তৈরি (উইকিপিডিয়া অনুসারে)। ভেনিসের চিপা গলি আর উঁচুনিচু ব্রিজে কোনও গাড়ি চলে না। আট বর্গ কিলোমিটারের এই ছোট্ট শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হলো ওয়াটার ট্যাক্সি আর ভাপরেত্তো। সাথে সেই বিখ্যাত বিলাসবহুল গন্ডোলা তো আছেই! এক ঝলক দেখেই মুগ্ধ হয়ে যেতে হবে স্থাপত্যশৈলী দেখে। পুরো শহরটিকেই একটা যাদুঘর বললে ভুল হবে না। আমি ইউরোপের প্রায় পঞ্চাশটি শহর দেখেছি, কিন্তু ভেনিসের মত কোনটাই না। ভেনিসের তুলনা কেবল ভেনিস নিজেই।

ভেনিসের গ্রান্ড ক্যানাল
ভেনিসের গ্রান্ড ক্যানাল
ভেনিসের চিপা গলি রেস্টুরেন্ট দিয়ে ঢাসা
ভেনিসের চিপা গলি রেস্টুরেন্ট দিয়ে ঢাসা

প্রথমে আমরা ভেনিসের অলিতে-গলিতে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। অধিকাংশই খুব সরু গলি আর সংযুক্তকারী ব্রিজগুলোতে দু-তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়, যা বেশ পরিশ্রমসাধ্য। চিপা খালগুলোতে কোনও ভাপরেত্তো ঢুকতে পারে না। এসব খালে চলতে পারে একমাত্র চাপা গন্ডোলাগুলো। গন্ডোলা ভাড়া করা বেশ খরচের ব্যাপার। ভাড়াও নির্দিষ্ট করা নেই। আধ-ঘণ্টা গন্ডলা রাইডের ভাড়া পঞ্চাশ থেকে দুইশ পঞ্চাশ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। ভেনিসের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মনেই ছিলনা যে সকালে নাস্তা করা হয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুধায় যখন মাথা ধরে গেল, তখন মনে পড়ে গেল। ভাগ্যক্রমে সামনেই একটা সরু গলির মধ্যে ছোট একটা রেস্টুরেন্ট পেলাম। প্রধান টুরিস্ট এলাকার বাইরে হওয়ায় দাম বেশ কম। পেট পুরে চিংড়ি সালাদ আর গ্রিসিনি (ইতালির বিখ্যাত ব্রেড স্টিক) খেলাম। খাবার শেষ করলাম ইতালিয়ান এসপ্রেসো দিয়ে।

গন্ডোলা
গন্ডোলা, আমার জানা মতে অনেক বলিউডি গানের শ্যূটিং হয়েছে এসব গন্ডোলাতে

ভেনিসে প্রচুর বাংলাদেশী বাস করে। রাস্তাঘাটে প্রচুর বাংলাদেশী হকার। বিক্রয়-পণ্যের মধ্যে আছে বাচ্চাদের খেলনা, বাবল মেকার, রাবারের বল, ফুল, পানি ইত্যাদি। একজনের সাথে কথা বলে বুঝলাম এদের অধিকাংশই মানবেতর জীবনযাপন করে। এদের ব্যবসার পুঁজি খুবই কম আর সারাক্ষণেই থাকে পুলিশের তাড়া খাওয়ার ভয়। অন্য দিকে বেশ কিছু আফ্রিকান হকার দেখলাম। এরা বিক্রি করছে বিভিন্ন ইতালিয়ান ডিজাইনার ব্যাগের রেপ্লিকা। বিক্রিও বেশ ভাল, কেননা ইতালিয়ান ব্যাগ আর জুতো ফ্যাশান-প্রিয়দের কাছে খুবই সমাদৃত। এদের লাভও বেশি আর এদের চক্রও বেশ সংঘবদ্ধ। আমি প্রথমে এসব ব্যাগের দিকে নজর দেইনি। কিন্তু চোখের সামনে গুচ্চি, প্রাদা আর লুই ভুটনের ব্যাগ দেখে কী নিজেকে সংবরণ করা যায়? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটু ব্যাগ দেখছিলাম। পরে ভাল না লাগায় হাঁটা ধরলাম, দেখলাম বিক্রেতা আমাকে ডাকছে হেমা মালিনী বলে। খুবই মজা পেলাম। এর সাথে মনে হলো, ইস! ভারতীয়দের মত মার্কেটিং আমরা কেন পারি না।

ভেনিসের অলিগলি
ভেনিসের অলিগলি

এরপর হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ভেনিসের মার্কেটের কাছে। বিভিন্ন তাজা তাজা মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণী দেখলাম। ছিল ইয়া বড় অক্টপাস আর পিরানহাও। একপাশে বিক্রি হচ্ছিল স্কুইডের রিং আর চিংড়ি মাছ ভাজা। ড্রিঙ্কসহ এক বাটির দাম পাঁচ ইউরো। দুজনে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খেলাম। এরপর ভাবলাম বিখ্যাত রিয়াল্টো ব্রিজ দেখতে যাব।

গ্র্যান্ড ক্যানালের উপরে যে চারটি ব্রিজ আছে তার মধ্যে এই রিয়াল্টো ব্রিজ সবচেয়ে পুরানো। অনেক জায়গায় এই ব্রিজে যাওয়ার দিক দেখানো থাকলেও, তা খুবই বিভ্রান্তিকর। রিয়াল্টো ব্রিজ খুঁজতে খুঁজতে কিছু জনমানবহীন গলিতে গেলাম। দেখলাম, খালের পানিতে ময়লা ভাসছে। আসলে প্রধান পর্যটন খালগুলোর পানি পরিস্কার করার হলেও এসব জায়গায় পানি ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটাহাঁটি করার পর আমরা বুঝলাম-এইবার ম্যাপ দেখতে হবে। তবে ভেনিসে গিয়েছে কিন্তু হারিয়ে যায়নি, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

রিয়াল্টো ব্রিজ
রিয়াল্টো ব্রিজ
বলুনতো কোন দিকে যাই?
বলুনতো কোন দিকে যাই?

অবশেষে ম্যাপ দেখে আসলাম রিয়াল্টো ব্রিজের কাছে। এসেই দেখলাম লোকে লোকারণ্য, এত ভিড়! আসলে পুরো ভেনিসজুড়েই আমার মনে হয়েছে প্রচণ্ড লোক সমাগম। কিন্তু এর মাঝেও সবার চোখে মুখে আনন্দ আর বিস্ময়। সবাই যার যার মত উপভোগ করছে। রিয়াল্টো ব্রিজ জুড়ে বিভিন্ন স্যুভেনিরের দোকান। আর এইসব স্যুভেনিরের একটা বড় অংশ হলো মুখোশ। প্রায় এক হাজার বছর ধরে ভেনিসে প্রতি বছর কার্নিভাল হয়। এই কার্নিভালে সবাই মুখোশ পরে অংশ নেয়। সেই মুখোশেরও অনেক বাহার। বিভিন্ন জায়গায় দেখলাম ট্র্যাডিশনাল ভেনিসিয়ান জামা আর মুখোশ পরে অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই এদের কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, বিনিময়ে এরা পাচ্ছে দক্ষিণা।

মাস্ক পরিহিত-পরিহিতা
মাস্ক পরিহিত-পরিহিতা
ভেনিসিয়ো মাস্ক খুব জনপ্রিয় স্যুভেনির
ভেনিসিয়ো মাস্ক খুব জনপ্রিয় স্যুভেনির

রিয়াল্টো ব্রিজ দেখতে দেখতে দুইটা বেজে গেল। আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম। তারপর ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার বেরুলাম ভেনিস দেখতে। কোথাও ঘুরতে আসলেই আবার আমার ভোজনপ্রিয় বরের দুই ঘণ্টা পরপর ক্ষুধা পেয়ে যায়। আমরা ভাবলাম কোনও রেস্টুরেন্টে বসে ভালমন্দ কিছু খাব। জার্মানিতে দেখেছি রেস্টুরেন্টের বাইরে মেন্যু আর দাম লেখা থাকে। সেটা দেখে পছন্দ হলে ভিতরে গেলে তারপর ওয়েটার এগিয়ে আসে। কিন্তু এখানে রেস্টুরেন্টের কাছে গেলেই ওয়েটার বন জর্নো  বলে দরজায় চলে আসে। আমরা সাবধানে  রেস্টুরেন্টের কাছ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। একটা রেস্টুরেন্ট পছন্দ হওয়ায় ভিতরে গিয়ে বসলাম। পিৎজা খেয়ে বিল দেবার সময় দেখলাম দুইজনের তিন তিন ছয় ইউরো বিল করেছে টেবিল চার্জ বা করপেতো হিসেবে। আমরা কথা না বাড়িয়ে বিল দিলাম। যারা ভেনিসে বা ইতালিতে যাবেন, তারা এই টেবিল চার্জের ব্যাপারে প্রথমেই আলাপ করে নিবেন।

ইতালীয়রা প্রচন্ড শিল্পপাগল জাতি, তার একটি নমুনা এই স্ট্রীট আর্ট
ইতালীয়রা প্রচন্ড শিল্পপাগল জাতি, তার একটি নমুনা এই স্ট্রীট আর্ট

এবার দেখার প্ল্যান করেছি পিয়াজ্জা সান মারকো। নেপোলিয়ন এই পিয়াজ্জাকে বলতো ‘ইউরোপের ড্রয়িং রুম’। এখানের দৃশ্যটা এতো সুন্দর যে পুরো বিকাল আর সন্ধ্যে ওখানে বসেই কাটিয়ে দিলাম। কিছু কিছু দৃশ্য বা কিছু কিছু অভিজ্ঞতা জীবনকে এমন ভাবে পালটে দেয় যে মনে হয়, জীবন যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ওই সন্ধ্যাটা আমার জন্য এমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল। বেশ রাত হয়ে যাওয়াতে আমরা ভাবলাম হোটেলে ফেরত যাই। তবে প্ল্যান করলাম- কালকে সকালে প্রথমেই এখানে আসব। রাতে ভেনিসের আলো আর খালে আলোর প্রতিফলন দেখতে দেখতে হোটেলের দিকে এগুলাম। পথে একটা রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম।

পিয়াজ্জা স্যান মারকোতে কাটান অপূর্ব সন্ধ্যা
পিয়াজ্জা স্যান মারকোতে কাটান অপূর্ব সন্ধ্যা
তালা ঝুলানো পার্টি সব জায়গাতেই আছে, আফসোস এভাবে যদি প্রেম টিকিয়ে রাখা যেত!
তালা ঝুলানো পার্টি সব জায়গাতেই আছে, আফসোস এভাবে যদি প্রেম টিকিয়ে রাখা যেত!

হোটেলে ফিরে এক ঘুমে রাত শেষ। হোটেলে সকালে কমপ্লিমেন্টারি নাস্তা ছিল। মাখন খেতে গিয়ে মনে হলো কেমন যেনও একটা গন্ধ। পরে দেখলাম মাখনটা মেয়াদ উত্তীর্ণ! পাঁচ তারকা হোটেলে এমন খাবার দেখে বাংলাদেশের ভেজালবিরোধী অভিযানের কথা মনে পরে গেল। খেয়ে-দেয়ে চেক আউট করে হোটেল রিসিপশনে ব্যাগ জমা রেখে বের হলার আবার পিয়াজ্জা সান মারকো দেখতে। এবার ইচ্ছে ছিল পাশের সান মারকো ব্যাসিলিকা দেখার। এই ব্যাসিলিকার ছাদ নাকি ক্রুসেডরদের আনা সোনা দিয়ে মোড়ানো। কিন্তু বিধিবাম। রবিবার হওয়ার কারণে ভিতরে প্রার্থনা চলছিল। তাই আর ভিতরে ঢোকা হল না।

বাইরে থেকে স্যান মারকো ব্যাসিলিকা
বাইরে থেকে স্যান মারকো ব্যাসিলিকা

আমরা কেউই আর্ট ভাল বুঝি না। তাই ভাবলাম আর্ট মিউজিয়ামে না গিয়ে সায়েন্স মিউজিয়ামে যাব। ভেনিসে অল্প কয়েকদিনের অতিথি ছিলেন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। সেই সময়ে ভেনিসে বসে করা তাঁর কিছু সায়েন্টিফিক আইডিয়ার ড্রাফট আর মডেল দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘দ্য জিনিয়াস অফ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি’ মিউজিয়ামটি। আমরা টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে দেখলাম বিভিন্ন প্রদর্শনী। এর মধ্যে আছে দ্যা লাস্ট সাপারের রেপ্লিকা আর বিভিন্ন মেশিনের স্কেচ। ওই যুগে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়েও এতো কিছু মাথায় কিভাবে আসে ভাবলে অবাক লাগে।

দ্যা জিনিয়াস অফ লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি মিউজিয়াম
দ্যা জিনিয়াস অফ লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি মিউজিয়াম
দ্যা লাস্ট সাপারের একটা রেপ্লিকা আছে মিউজিয়ামটাতে
দ্যা লাস্ট সাপারের একটা রেপ্লিকা আছে মিউজিয়ামটাতে

প্রধান ভেনিস অঞ্চলের চারিদিকে ছোট ছোট অনেক দ্বীপ আছে, যেগুলো ভেনিসের মতই সুন্দর। আমরা প্রধান ষ্টেশনের সামনেই কিছু পর্যটন অফিস দেখেছি। একটা ট্যুর দেখলাম মুরানো, বুরানো আর লিডো দ্বীপ ঘুরে দেখাবে। শনিবারই ঠিক করে ছিলাম এই দুই জায়গায় যাব। তাই তাড়াতাড়ি পিয়াজ্জা সান মারকো থেকে প্রধান ষ্টেশনে আসলাম। পরে অফিস থেকে জানালো এই ট্যুর ছাড়ে পিয়াজ্জা সান মারকো থেকেই আর এখন আবার পিয়াজ্জা সান মারকোতে ফিরে গেলেও যেতে যেতে জাহাজ আর পাবো না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরে আমার বর ভাপরেত্তোর রুট দেখে বলল ভাপরেত্তোতেও যাওয়া যাবে।

সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল হয় যদি আমরা ২৪ ঘন্টার ভাপরেত্তো টিকেট কাটি। কিন্তু আমরা ভেনিসে থাকব আর মাত্র ৭ ঘণ্টা। ২৪ ঘন্টার টিকেট কেটে কী হবে? কি করা যায় ভাবছি দুজনে। এরইমধ্যে দেখলাম একজন আমেরিকান টিকেট বিক্রির জন্য কাউকে খুঁজছে। সে জানালো, সে ও তার গার্ল ফ্রেন্ড সাত দিনের জন্য টিকেট কেটেছিল। এখন তারা চলে যাবে, কিন্তু টিকেটের মেয়াদ আছে আরও বার ঘণ্টা। আমরাও মেশিনে চেক করে দেখলাম টিকেট ঠিক আছে। তাই তার কাছ থেকে অনেক কম দামে টিকেট কিনলাম। তারপর মুরানো যাওয়ার ভাপরেত্তোতে চাপলাম।

চারিদিকেই ভেনিসের অবাক করা স্থাপত্য
চারিদিকেই ভেনিসের অবাক করা স্থাপত্য

ভাপরেত্তোতে গ্র্যান্ড ক্যানালে ঘুরতে বেশ মজা লাগলো। মুরানো দ্বীপটি বেশি দূরে না। অল্প সময় পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম। দ্বীপটা একদম ছোট, বিখ্যাত হলো রঙ-বেরঙের সূক্ষ্ণ কাঁচ বানাবার জন্য। আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না। মুরানোতে অল্প একটু হাঁটাহাঁটি করেই আবার ভাপরেত্তোতে চরলাম। এবারের গন্তব্য সিমেটেরো নামক একটি দ্বীপে। এই দ্বীপটি পুরোটাই বিভিন্ন সমাধি দিয়ে তৈরি। সমাধিক্ষেত্রের পবিত্রতা রক্ষায় কোনও ছবি তোলা বা জোরে আওয়াজ করা নিষিদ্ধ। অনেক জাঁকজমকপূর্ণ কফিন দেখলাম। মৃত্যুকে অবিনশ্বর করার থেকে যদি জীবিত অবস্থার কাজকে অবিনশ্বর করায় আমরা মন দিতাম, তাহলে পৃথিবী অনেক বদলে যেত।

খুব অল্প সময়ে সিমেটেরো দেখে আমরা ভাপরেত্তোতে চাপলাম লিডোর উদ্দেশ্যে। এই দ্বীপটি লম্বায় অনেক বড়, কিন্তু চওড়ায় অনেক ছোট। মাত্র বিশ মিনিটেই আড়াআড়ি ভাবে দ্বীপটির এক পাশ  থেকে আরেক পাশে যাওয়া যায়। লিডো বিখ্যাত হলো এর সৈকতের জন্য। লিডোর সৈকতে এসে মনে হলো, এই ছোট্ট সৈকতের এতো নাম! আমাদের কক্সবাজার দেখলে তো এদের মাথা খারাপ হয়ে যাবে। কক্সবাজারে অবশ্য এতো সংক্ষিপ্ত কাপড় পরা যাবে না। বীচে কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে ফেরার পথে রওনা দিলাম। মাঝখানে ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেলাম। রেস্টুরেন্ট জুড়ে সোফিয়া লরেনের ছবি। সানফ্লাওয়ার আর টু উমেনের পোস্টার দেখলাম। এরপর ফেরত আসলাম মূল ভেনিস ভূখণ্ডে।

লিডো বীচ
লিডো বীচ
ম্যুরানো দ্বীপ
ম্যুরানো দ্বীপ
বিখ্যাত ম্যুরানো গ্লাস ওয়ার্ক
বিখ্যাত ম্যুরানো গ্লাস ওয়ার্ক

এরইমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেনিসে শেষ কিছু সময় কাটালাম খালের পাড়ে বসে। তারপর যাত্রা পথের জন্য কিছু খাবার-দাবার কিনে হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে রওনা দিলাম ট্রেন ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে গেলাম কিছু অসাধারণ মুহূর্ত আর স্মৃতি, পেছনে থাকল ভেনিস।

2 Replies to “দুই দিনের ভেনিস ভ্রমণ- A weekend in Venice”

  1. মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম says: Reply

    খুব ভাল লাগল লেখাটা। গত জুনে ১ দিনের জন্য ভেনিস বেড়াতে গিয়েছিলাম, আপনার চোখে আরেকবার দেখা হয়ে গেল…. 🙂

    1. Tasnuva Sarowar says: Reply

      আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ

Leave a Reply